জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ্-এর জন্য শাসকের অনুমতি কি আবশ্যক?



মুল: শাইখ মুহাম্মাদ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ

অনুবাদ: মুহাম্মাদ আখলাক উজ-জামান
 
প্রশ্ন:
জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ্-এর জন্য শাসকের অনুমতি কি আবশ্যক?
উত্তর:
আলহামদুলিল্লাহ।
গত প্রশ্নের উত্তরে* জিহাদের হুকুম ও এর প্রকারভেদ সম্পর্কিত একটি আলোচনা রয়েছে। যাতে বলা আছে যে জিহাদ ব্যাক্তিবিশেষের উপর ফরয (ফরযে আ'ইন) হতে পারে যদি শত্রুরা মুসলিমদের আক্রমণ করে, এবং এমতাবস্থায় তাদের মোকাবিলা করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরয হয়ে যায়, এবং শাসকের অনুমতি এখানে আবশ্যক নয়।
সেই জিহাদের ক্ষেত্রে যার উদ্দেশ্য হলো কুফফারদের উপর বিজয় লাভ ও তাদেরকে ইসলামের দিকে আহব্বান করা, এবং তাদের সাথে লড়াই করা যারা আল্লাহর বিধানের আনুগত্য করতে নারাজ, এই ক্ষেত্রে শাসকের অনুমতি আবশ্যক, যাতে করে বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রিত থাকে।
▪ ইবনু ক্বুদামাহ্ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,
“জিহাদের ব্যাপারটা শাসকের হাতে এবং তার ইজতিহাদের উপর নির্ভরশীল, এবং জনগণ অবশ্যই তার আনুগত্য করবে এই ব্যাপারে যা কিছু সে উপযোগী মনে করে।”
উদ্ধৃতিটি শেষ।
আল-মুগনী (১০/৩৬৮)
ইমামের অনুমতি প্রয়োজন বিশৃঙ্খলা এড়াতে যা ঘটতে পারে যদি কিছু মুসলিম আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তাদের নিজেদের পরিস্থিতি ও ক্ষমতার এবং শত্রুর ক্ষমতার তোয়াক্কা না করে।
▪ স্টান্ডিং কমিটির উলামাগণ বলেছেন,
“জিহাদের উদ্দেশ্য হলো ‘আল্লাহ’ শব্দটিকে মহীয়ান করা এবং দ্বীন ইসলামের প্রতিরক্ষা করা এবং এটাকে প্রচার ও প্রসার যোগ্য করে তোলা; এবং এর পবিত্রতা রক্ষা করা প্রত্যেক(মুসলিমের) জন্য ওয়াজিব, যারা তা করার সামর্থ্য রাখে। কিন্তু এটা জরুরী যে, সৈন্যদল সংঘবদ্ধ থাকবে এবং তাদেরকে পাঠানো হবে সুশৃঙ্খলভাবে, অন্যথায় এটি বিশৃঙ্খলার দিকে এগোবে এবং এমন সব ঘটনা ঘটবে যা দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি বয়ে আনবে। অতএব জিহাদের আরম্ভ ও ব্যাবস্থার দায়িত্ব মুসলিদের শাসকের উপর অর্পিত, এবং উলামাদের অবশ্যই তাকে(শাসককে) উৎসাহিত করতে হবে। যদি সে(শাসক) জিহাদ আরম্ভ করে এবং মুসলিমদের সংহত করে, তবে যার সামর্থ্য আছে তার জন্য এ ডাকে সারা দেয়া আবশ্যক, একাগ্রতার সাথে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করে, এবং সত্যকে সমর্থনের আশায়, এবং ইসলামকে সুরক্ষিত রাখতে। যে পিছনে পড়ে থাকবে জিহাদের ডাক দেয়ার পরে, এবং কোন ওযর নেই, তবে সে গুনাহগার।”
উদ্ধৃতিটি শেষ।
ফাতাওয়া আল-লাযনাহ্ আদ-দা'য়িমাহ্ (১২/১২)
যদি জনগন শাসকের ডাকে একত্রিত হয়, সেটা তাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে, তাছাড়াও তারা ইসলামিকভাবে শাসককে মান্য করতে বাধ্য যা কিছু আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে না যায়। অতএব মুসলিমরা জিহাদে একত্রিত হবে, ইসলামের সমর্থনে এবং আল্লাহর বিধানের প্রতিরক্ষায়।
▪ শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
“এটা লক্ষ্য করা উচিত যে জনগণের বিষয়াদি পরিচালনার জন্য একজন ইমাম নিযুক্ত করা অন্যতম বৃহত্তর দ্বীনি কর্তব্য, যা ছাড়া কোন দ্বীনি কিংবা দুনিয়াবি বিষয় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না, কারন আদম সন্তানের সর্বোত্তম স্বার্থ ঐক্যবদ্ধ না হয়ে অর্জন করা যায় না, কেননা তাদের পরস্পরকে প্রয়োজন। তারা যখন ঐক্যবদ্ধ হয় তখন নেতৃত্ব থাকা জরুরী। নাবী ﷺ বলেছেন: "যদি তিনজন ব্যাক্তি সফরে বের হয়, তাদের মধ্যে একজনকে যেন দায়িত্বে নিযুক্ত করে।" --- আবু দাউদ বর্ণনা করেন আবু সা'ঈদ ও আবু হুরায়রা(রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) থেকে। ইমাম আহমাদ তার মুসনাদে আব্দুল্লাহ ইবনু 'আমর(রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেন যে নাবী ﷺ বলেছেন: “তিনজন ব্যাক্তির জন্য মরুভূমি বা কোন প্রান্তরে অবস্থান বৈধ নয়, তাদের মধ্যে একজন দায়িত্বশীল নিযুক্ত করা ব্যাতিত।" সফররত ছোট ও অস্থায়ী একটি জামা'আতের জন্য দায়িত্বশীল নিযুক্ত করা বাধ্যতামূলক হওয়া ইঙ্গিত দেয় যে এটি সব ধরনের জামা'আতের জন্য প্রযোজ্য। এবং আল্লাহ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন সৎ কাজের নির্দেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য, যা শুধুমাত্র একটি শক্তিশালী ও কতৃত্বশীল অবস্থান থেকে অর্জন করা সম্ভব, এবং একই বিষয় প্রযোজ্য হবে সবকিছুর ক্ষেত্রে যা তিনি(আল্লাহ) আদেশ করেছেন, যেমন জিহাদ, বিচার, হাজ্জ কায়েম করা, জুমু'আহ এবং ইদ, একই সাথে মাজলুমদের সমর্থন করা এবং হদ্দের শাস্তি প্রদান করা --- এটা একটি শক্তিশালী ও কতৃত্বশীল অবস্থান ব্যাতীত অর্জন করা সম্ভব নয়। অতঃপর এটি বর্নিত আছে যে "শাসক দুনিয়াতে আল্লাহর ছায়াস্বরুপ" এবং "জালিম শাসকের সাথে ষাট বছর শাসকহীন এক রাতের চেয়ে উত্তম।" অভিজ্ঞতা এমনটিই প্রমান করে।”
উদ্ধৃতিটি শেষ।
মাজমূ আল-ফাতাওয়া (২৮/৩৯০, ৩৯১)
▪ শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু সালিহ আল-উসাইমিন (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:
“সেনাবাহিনীর জন্য জন্য জায়েয নয় যে তারা ক্যাম্পেইনে বের হবে শাসকের অনুমতি ব্যাতিত, পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, কেননা জিহাদে লড়াই করার আদেশ ও এর ব্যাবস্থা করা যাদের দিকে সম্বোধন করা হয় তারা হলো শাসকগোষ্ঠী, কোন ব্যাক্তিবিশেষ নয়। ব্যাক্তিবিশেষদের সিদ্ধান্ত-গ্রহনকারীর অনুসরণ করতে হবে। সুতরাং ইমামের অনুমতি ছাড়া কারো জন্যই লড়াই করা যায়েজ না, আত্মরক্ষা ব্যতীত। যদি শত্রু হঠাৎ আক্রমণ করে বসে আর তারা(মুসলিমরা) তার(শত্রুর) ক্ষতির আতঙ্কে থাকে, তবে তারা তাদের আত্মরক্ষা করতে পারবে, কেননা সেক্ষেত্রে লড়াই করা ব্যাক্তিবিশেষের উপর ফরয(ফরযে 'আইন) হয়ে যায়।
যে কারনে এটি(শাসকের অনুমতি ছাড়া জিহাদ) অনুমোদিত নয় তা হলো জিহাদের বিষয়টা শাসকের দায়িত্ব, আর তার অনুমতি ছাড়া লড়াই করা তার অধিকারের লঙ্ঘন ও সীমা অতিক্রম করা। যদি জনগনের জন্য শাসকের অনুমতি ছাড়া জিহাদ করা যায়েজ হতো তবে তা বিশৃঙ্খলার দিকে নিয়ে যেত। প্রত্যেক যে ব্যাক্তি ইচ্ছা করতো সে ঘোড়ায় সাওয়ার হয়ে লড়াইয়ে বের হতো, আর এটা যায়েজ হলে অনেক নেতিবাচক পরিণতি বয়ে আনতো। কিছু মানুষ হয়তো নিজেদেরকে যুদ্ধসাজে সজ্জিত করতো যে তারা শত্রুর সাথে লড়াই করতে চায় কিন্তু তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা, অথবা অন্য একটি দলের লোকজনদের আক্রমণ করে অনিষ্ট ছড়িয়ে দেয়া, যেমনটি আল্লাহ বলেন,
”আর যদি মুমিনদের দু’দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তাহলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।”
[আল-হুজুরাত ৪৯:৯]
এই তিনটি কারন এবং আরো অন্যান্য কারনে শাসকের অনুমতি ব্যতীত জিহাদ যায়েজ নয়।”
উদ্ধৃতিটি শেষ।
আশ-শারহুল মুমতি' (৮/২২)।
ওয়াল্লাহু আ'লাম।
মুল ফাতওয়ার লিংক:
ইংরেজি: islamqa.info/en/answers/69746/

Post a Comment

0 Comments